কর্ণ পিশাচিনী সাধনা গোপণ রহস্য
তন্ত্র শাস্ত্রে ‘কর্ণ পিশাচিনী’ সাধনা একটি অত্যন্ত রহস্যময় এবং বামাশ্রমী (Tantric Vama Marga) পদ্ধতি। এটি মূলত ‘ক্ষুদ্র বিদ্যা’ বা ‘সিদ্ধি’র অন্তর্গত। 
নিচে শাস্ত্রীয় শ্লোক ও তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. কর্ণ পিশাচিনী কে?
তন্ত্র মতে, কর্ণ পিশাচিনী হলো একজন নিম্নস্তরের দেবী বা পিশাচী শক্তি। ‘কর্ণ’ শব্দের অর্থ কান। লোকবিশ্বাস ও তন্ত্রমতে, এই সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলে ওই শক্তি সাধকের কানে কানে অন্যের গোপন কথা বা ভবিষ্যৎবাণী বলে দেয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে এটি জাগতিক কৌতূহল মেটানোর জন্যই বেশি ব্যবহৃত হয়।
২. শাস্ত্রীয় শ্লোক ও অর্থ
বিখ্যাত তন্ত্রগ্রন্থ ‘ডামর তন্ত্র’ এবং ‘শারদা তিলক’-এ এই ধরণের সাধনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণ পিশাচিনী মন্ত্রের একটি বহুল প্রচলিত শ্লোক বা মন্ত্র হলো:
”ॐ হ্রীং কর্ণপিশাচিনি মে কর্ণে কথয় হ্রীং ফটু স্বাহা।”
(অক্ষরভেদে মন্ত্রের সামান্য পরিবর্তন হতে পারে)
হ্রীং: এটি মায়া বীজ, যা শক্তিকে আবাহন করে।
মে কর্ণে কথয়: এর অর্থ “আমার কানে বলো”। সাধক প্রার্থনা করেন যেন দেবী তার কানে সমস্ত সত্য প্রকাশ করেন।
ফটু স্বাহা: এটি কর্মে গতি এবং সিদ্ধি প্রদানের জন্য ব্যবহৃত তান্ত্রিক শব্দ।
৩. সাধনার প্রকৃতি ও পদ্ধতি
এই সাধনা অত্যন্ত কঠিন এবং এতে অনেক ঝুঁকি থাকে। শাস্ত্র অনুযায়ী এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
নির্জনতা: এই সাধনা সাধারণত শ্মশান বা কোনো নির্জন স্থানে গভীর রাতে করা হয়।
ব্রহ্মচর্য ও শুদ্ধি: সাধককে কঠোর শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধি বজায় রাখতে হয়। সামান্য ভুলে হিতে বিপরীত হওয়ার ভয় থাকে।
উপচার: মূলত মদ, মাংস বা নির্দিষ্ট তান্ত্রিক উপচারের মাধ্যমে এই শক্তির পূজা করা হয়।
কর্ণ পিশাচিনী সাধারণত বর্তমান ও অতীতের খবর দেয়, কিন্তু ভবিষ্যতের সঠিক তথ্য বা মোক্ষ প্রদানে অক্ষম।যদি সাধক ভয় পান বা মন্ত্র উচ্চারণে ভুল করেন, তবে পিশাচী সাধকের ক্ষতি করতে পারে বা তাকে উন্মাদ করে দিতে পারে।
এই সিদ্ধি লাভ করলে সাধকের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং মৃত্যুর পর তাকে এই পিশাচী শক্তির দাসত্ব করতে হয়।সনাতন ধর্মে বা মূলধারার আধ্যাত্মিকতায় এই ধরণের সাধনার চেয়ে ঈশ্বর ভক্তি বা যোগ সাধনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্ণ পিশাচিনী সাধনা মূলত জাদুকরী প্রভাব বা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা প্রকৃত মোক্ষ বা শান্তি লাভের পথে অন্তরায় হতে পারে।
– তারানাথ তান্ত্রিক